ডেটলাইন ঈশ্বরদীঃ বিগত বছরে দশ মাসে আট হত্যাকান্ড

ডেইলি ভিশন টুয়েন্টিফোর অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২:১৭ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ৯, ২০২২

ঈশ্বরদীতে বিগত বছরের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৮টি হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। বৃদ্ধা, গৃহবধূ, ছাত্র, যুবক থেকে শুরু করে ভিক্ষুকও হত্যার তালিকায় রয়েছে। তবে হত্যাকান্ডের পর বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই দ্রুততম সময়ের আসামি চিহ্ণিত এবং গ্রেপ্তার হয়েছে। এছাড়া অধিকাংশ ঘটনার প্রতিবেদন আদালতে জমা দেয়া হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

গত বছরের ৩১ মার্চে শহরের চারাবটতলা এলাকায় আনোয়ারা খাতুন নামে ৬৫ বছরের এক বৃদ্ধাকে বাড়িতে ঢুকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। এঘটনায় ঈশ্বরদী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। পুলিশ একজনকে আটক করে। তবে ঘটনার মূল রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিআইবি) তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বলে থানা সূত্রে জানা গেছে।

এক মাস পর (৩০ এপ্রিল) মশুরিয়াপাড়ায় বাড়িতে এসে পরিকল্পিতভাবে মুক্তি খাতুন রিতা (২৭) নামে গৃহবধূকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত চারজনের মধ্যে তিনজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। একজন এখনও পলাতক রয়েছে। টাকা দিয়ে রূপপুর প্রকল্পে চাকরি না পাওয়ায় এই হত্যাকান্ড সংঘঠিত হয়েছে বলে গ্রেপ্তারকৃতরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে হত্যাকান্ডের দায় স্বীকার করেছে। পুলিশ জানিয়েছে মামলা আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

পরকীয়া আর জমির ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণে শাকিল আহমেদ নামে ব্যবসায়ীকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। ঈশ্বরদী সরকারি কলেজের সামনে ভাড়া বাসা থেকে গত ২৮ মে রাতে কাপড় ব্যবসায়ী শাকিলের মরদেহ পুলিশ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় শাকিলের স্ত্রী মিম খাতুন ও আপন ছোট ভাই সাব্বির আহমেদকে পুলিশ আটক করে। হত্যারকান্ডের সাথে জড়িত থাকার কথা তারা আদালতে জবানবন্দিতে স্বীকার করে। ৩০ মে শাকিলের মামা কোরবান আলী বাদী হয়ে ঈশ্বরদী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এই হত্যাকান্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করে মামলার চার্জশিট আদালতে দাখিল করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

শাকিলের পর ভিক্ষুক মিলন হোসেন চাপাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। ২৪ জুন পরিকল্পনা অনুযায়ী ভিক্ষুক মিলন হোসেনকে গলা টিপে ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্লেড দিয়ে কেটে ক্ষত-বিক্ষত করে এবং বিদ্যুৎস্পর্শ করে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকান্ডের রহস্যও উদ্ঘাটন করে পুলিশ। পাওনা টাকা দিতে কালক্ষেপণ নিয়ে বাকবিতন্ডার কারণে এই হত্যাকান্ড সংঘঠিত হয় বলে পুলিশী তদন্তে রহস্য উদঘাটিত হয়েছে। এই হত্যাকান্ডে জড়িত চারজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। তারা জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে।

বিগত ১১ আগস্ট পৌর এলাকার সাঁড়া গোপালপুর এলাকায় শ্বশুরবাড়ি থেকে ১৮ বছর বয়সি মেঘলা খাতুন নামে এক গৃহবধূর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়। গৃহবধূর বাবা হাফিজুল ইসলামের অভিযোগ মেঘলাকে নির্যাতন করে মেরে ফেলা হয়েছে। মামলায় শ্বাশুড়িকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি কারাগারে রয়েছেন। গৃহবধূ মেঘলার স্বামী পলাতক রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। মামলাটির এখনও তদন্ত চলছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

১০ ডিসেম্বর অপহরণের চার দিন পর কলেজ ছাত্র রাইমুল ইসলাম হৃদয়ের (২২) ১০ টুকরো লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ১৩ ডিসেম্বর রাত ৯টার দিকে দাশুড়িয়ার নওদাপাড়া গ্রামে চাঁদ আলী নামের ব্যক্তির বাড়ির ঘরের মেঝে খুঁড়ে হৃদয়ের লাশের টুকরো উদ্ধার হয়। বাড়িতে থাকা হোসেন আলীকে আটক করে পুলিশ। হৃদয় পাবনা সরকারি এডওয়ার্ড কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র ছিল। রূপপুর প্রকল্পে চাকরির জন্য দেয়া টাকা ফেরত না পাওয়ায় হৃদয়কে হত্যা করেছে বলে পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে হোসেন আলী। সে পাবনা কারাগারে রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

সর্বশেষ ২১ ডিসেম্বর সকালে দাশুড়িয়ার মুনশিদপুর গ্রামে এক অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূকে ধারালো রামদা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। শারমীন শিলা (৩২) নামে গৃহবধূকে কুপিয়ে হত্যা করে সুমন আলী নামে এক যুবক। এ ঘটনায় গৃহবধূর স্বামী রানাউর রহমান আহত হয়। ঘটনার পর হামলাকারীকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেন এলাকাবাসী। আটক সুমন আলী (৩০) একই উপজেলার সরাইকান্দি গ্রামের আজগর আলীর ছেলে। পুলিশ জানায়, আটক সুমন আলী এই হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে বলে পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে।

এসব হত্যাকান্ড বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ঈশ্বরদী সার্কেল) ফিরোজ কবীর বলেন, এসব বিচ্ছিন্ন হত্যাকান্ডের ঘটনায় আইন-শৃংখলার অবনতি বলার সুযোগ নেই। চারাবটতলার বৃদ্ধা আনোয়ারা খাতুন ছাড়া সব হত্যাকান্ড ব্যক্তিগত সম্পর্ক কেন্দ্রীক। জমি ভাগাভাগি, পরকীয়া এবং লেদেনকে কেন্দ্র করে সম্পর্কের অবনতি হওয়ার কারণে হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে।

অফিসার ইনচার্জ আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, এসব ঘটনার আগাম কোন তথ্য পাওয়ার সুযোগ ছিলো না। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে হত্যাকান্ড সংঘঠিত হওয়ার ৪৮ ঘন্টার মধ্যেই আসামী চিহ্ণিত ও গ্রেপ্তার হয়েছে। তারা দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দিও দিয়েছে। অধিকাংশ মামলার চুড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা হয়েছে। আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশী তৎপরতা আরো জোরদার করা হয়েছে বলে জানান তিনি।