ফিরে দেখা ২০২১

২০২২ সালের মাঝামাঝি রূপপুর প্রকল্পের ১ম ইউনিটে অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হচ্ছে

ডেইলি ভিশন টুয়েন্টিফোর অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০:০০ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ৩১, ২০২১

দেশের সর্ববৃহৎ মেগা প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে অবকাঠামোগত নির্মাণ কাজ করোনা পরিস্থিতিতেও যথেষ্ঠ অগ্রগতি হয়েছে। ২০২২ সালের মাঝামাঝি রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পের ১ম ইউনিটে অবকাঠামো নির্র্মাণ শেষ হচ্ছে কাজ শেষ হচ্ছে বলে জানা গেছে।

২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধনের পর ২০২১ সালে সর্বোচ্চ ২০ ভাগ অবকাঠামোগত অগ্রগতি হয়ে ৫০ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ৩+ প্রজন্মের দুটি রুশ ভিভিইআর-১২০০ রিয়্যাক্টর ইউনিট-১ এবং ইউনিট-২ এর নির্মাণ কাজ ছয় মাসের ব্যবধানে সমান গতিতে এগিয়ে চলেছে। এরই মধ্যে ২০২১এর ১০ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী  ইউনিট-১ এর ৩৩০ টন ওজনের রিয়্যাক্টর পাওয়ার ভেসেলটি (পরমাণু চুল্লি) ডিজাইন পজিশনে স্থাপন কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছেন। করোনার মধ্যেও এই অনুষ্ঠানে রুশ পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক এলেক্সি লিখাচেভ স্বশরীরে ঈশ্বরদীর রূপপুরে উপস্থিত ছিলেন। রাশিয়ানসহ প্রায় পাঁচ হাজার বিদেশী নাগরিক এখন ঈশ্বরদীর রুপপুরে অবস্থান করে নির্মাণ কাজ নিয়ে যাচ্ছেন। বিদেশীসহ বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বিভিন্ন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের রাশিয়ান স্পুতনিক-ভি টিকা প্রদান নিশ্চিত করা হয়েছে।

২০২৩ সালে ১ম ইউনিট এবং ২০২৪ সালে ২য় ইউনিট কন্সট্রাকশন ও কমিশরিং  সম্পন্নের লক্ষ্য নির্ধারণ করে সিডিউল অনুযায়ী অকাঠামোগত কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে নেয়া হচ্ছে । তবে অবকাঠামোগত নির্মাণ কাজ শেষ হলেই প্রজেক্টের কাজ শেষ হয়েছে বলে মনে করার কোন কারণ নেই । আর্ন্তজাতিক রীতিনীতি মেনে  সকল বিষয় যথাযথভাবে পালন করা হয়েছে বলে নিশ্চিত হলেই আইএইএ-এর স্বীকৃতি পাওয়ার পর জ্বালানী প্রাপ্তি এবং কমিশনিং করা সম্ভব হবে।

প্রকল্প পরিচালক ড. শৌকত আকবর জানান, সিডিউল অনুযায়ী  ১ম ইউনিটে সকল কম্পোমেন্ট স্থাপন করা হয়েছে। ডোম স্থাপনের পর ঢালাইয়ের কাজ চলমান । বাঁকি রয়েছে রাউটার কম্পোমেন্ট ওয়াল। ২০২২ সালের মাঝামাঝি অবকাঠামো নির্মাণ শেষ করে অক্টোবরে ‘ষ্টার্ট অব এ্যাডজাস্টমেন্ট’ বা প্রি-কমিশনিং কাজ শুরু হবে। ষ্টার্ট অব এ্যাডজাস্টমেন্ট হলো রিয়্যাক্টর বিল্ডিংয়ে স্থাপনকৃত প্রত্যেকটি কম্পোনেন্ট (যন্ত্রপাতি) আলাদাভাবে পরীক্ষা করা। এই কাজে সময় লাগে প্রায় এক বছর। যাতে কন্সট্রাকশন শেষে ২০২৩ সালে কমিশনিং করে নিউক্লিয়ার ফুয়েল (জ্বালানী) লোডিং এর ব্যবস্থা করা যায়।

তিনি আরো জানান, শুধু কন্সট্রাকশন শেষ হলেই যে বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হবে তা নয়। কন্সট্রাকশন শেষ হওয়ার পর নিউক্লিয়ার প্লান্টের কমিশনিং শুরু হবে। আর কমিশনিং কাজের সাথে অনেকগুলো কম্পোমেন্ট জড়িত। কমিশনিং এর তিনটি ষ্টেজ রয়েছে।  মূল কমিশনিং হবে, যখন জ্বালানী লোডিংয়ের পর রিয়্যাকশন শুরু হবে। মূল জ্বালানী লোডিংয়ের সাথেও অনেকগুলো অবকাঠামো জড়িত রয়েছে। নিউক্লিয়ার প্লান্টের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হলো নিউক্লিয়ার গভর্নেন্স বা ম্যানেজমেন্ট। সেফটি, সিকিউরিটি এবং সেফগার্ডস। এই তিনটির অবকাঠামো তৈরী সবচেয়ে জটিল। এখন যেগুলো কাজ হচ্ছে সেগুলো নিউক্লিয়ার সেফটি ম্যানেজমেন্ট। সেফগার্ড হলো নিউক্লিয়ার গভর্নেন্স। নিউক্লিয়ার গভর্নেন্স শুধু দেশের আইনের সাথে সম্পৃক্ত নয়। এরজন্য আর্ন্তজাতিক আইন, চুক্তি এবং রাষ্ট্রের  কমিটমেন্ট রয়েছে। এই তিনটি যথাযথভাবে প্রতিপালন ব্যতিরেকে শুধুমাত্র নিউক্লিয়ার কন্সট্রাকশন সম্পন্ন করলেই কমিশনিং বা জ্বালানী লোডিং করা যাবে না। এরসাথে আমাদের দেশের পারমাণবিক আইন, অবকাঠামো, পারমাণবিক নিরাপত্তা এবং নিউক্লিয়ার ম্যাটেরিয়ালের সেফগার্ড রাষ্ট্রের পক্ষে নিশ্চিত করতে হবে। এসব বিষয়ে বাংলাদেশের আন্তঃরাষ্ট্রিয় যে কমিটমেন্ট রয়েছে, সেগুলো আর্ন্তজাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) থেকে পরীক্ষার জন্য বিভিন্ন সময়ে অনেকগুলো প্রতিনিধি দল আসবে। নিউক্লিয়ার গভর্নেন্সের আন্তর্জাতিক রিকোয়ারমেন্ট শতভাগ প্রতিপালন হলেই রূপপুর নিউক্লিয়ার প্রজেক্টের সুন্দর কমিশনিং বিবেচিত হবে এবং আর্ন্তজাতিক পক্ষ হতে স্বীকৃতি পাওয়া যাবে বলে জানান তিনি।

পিডি বলেন, পরমাণু চুল্লি স্থাপনে আর্ন্তজাতিক রীতিনীতি অবজ্ঞা করার সুযোগ নেই। কোন দেশ যদি আর্ন্তজাতিক রিকোয়ারমেন্ট অবজ্ঞা করে নিউক্লিয়ার জ্বালানী লোডিং করে, তাহেল জাতিসংঘে আন্তঃরাষ্ট্রিয় চুক্তির অবজ্ঞা বলে বিবেচিত হবে। আর বাংলাদেশ তা কখনই চাইবে না।

পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ কাজ একটি মাত্র কম্পোনেন্ট। পারমাণবিক কর্মসুচির সাথে আরো এ্যাকিটভিটিজ জড়িত বলে জানান তিনি। দেশে পারমাণবিক কর্মসূচিকে টেকসই করার জন্য পারমাণবিক অবকাঠামো তৈরী অপরিহার্য্য। রূপপুরে কন্সট্রাকশন চলমান আছে। কন্সট্রাকশনের কাজ শেষ হওয়ার পর আমরা প্রথমে প্রিকমিশনিং করে অপারেশনে যাব। পরমাণু জ্বালানী সরবরাহ, জ্বালানী পরিবহন, জ্বালানী সংরক্ষণ এবং জ্বালানী সুষ্ঠু সুরক্ষার ক্ষেত্রে বেশ কিছু আর্ন্তজাতিক আইনী বাধ্যবাধকতা এবং অনুমোদনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। রাশিয়া বা বাংলাদেশ ইচ্ছে করলেই জ্বালানী পাঠাতে বা আনতে পারবে না। মুল কমিশনিং এর আগে আইনী বাধ্যবাধকতা পালন করা হচ্ছে কিনা, এগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আইএইএ এর পক্ষ হতে ভেরিভিকেশনের জন্য কযেকটি মিশন বাংলাদেশে আসবে। রূপপুর পারমাণবিকের অবকঠামোগত প্রস্তুতির পাশাপাশি জাতীয়ভবে সেফগার্ড প্রস্তুতির বিষয়টিও আর্ন্তজাতিকভাবে মনিটরিং করা হবে। বাংলাদেশ নিউক্লিয়ার জ্বালানীর সেফগার্ড নিশ্চিত করার জন্য জাতিসংঘ ও আইএইএ এর কাছে ১৫৪০ ধারা মতে দায়বদ্ধ। আইএইএর পক্ষ হতে সকল প্রস্ততি পরিমাপ ও মনিটরিং করা হবে। সকল বিষয় যথাযথভাবে পালন করা হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়ার পর আইএইএ-এর স্বীকৃতিতে জ্বালানী প্রাপ্তি এবং কমিশনিং (জ্বালানী লোডিং) করা সম্ভব হবে। কাজেই অবকাঠামোগত নির্মাণ কাজ শেষ হলেই প্রজেক্টের কাজ শেষ হয়েছে বলে মনে করার কোন কারণ নেই বলে জানিয়েছেন ড. শৌকত ।

প্রকল্পের সাইট ইঞ্জিনিয়ার আশরাফুল ইসলাম দুটি ইউনিটে ২০২১ সালে রিয়্যাক্টর ভবনের সম্পাদিত গুরুত্বপূর্ণ কাজের দিকগুলো তুলে ধরেছেন।

ইউনিট-১:

২০২১ সালের জানুয়ারীতে পোলার ক্রেন স্থাপন করা হয়। জুনে প্রেসাররাইজার এবং পরবর্তীতে দুই ধাপে ১২টি হাইড্রোএ্যকুলেটর বসানো হয়। ইনার কনন্টেইন ওয়ালের কংক্রিট ঢালাইয়ের কাজ শেষ হলে ডোম স্থাপন করা হয়েছে। ডোমের উপর প্রতি ২৫ দিনে ১.৫ মিটার ঢালাই কাজ চলমান রয়েছে। ১০ অক্টোবর রিয়্যাক্টর পাওয়ার ভেসেল স্থাপন উদ্বোধনের পর এটি ঘিরে ৪টি ষ্টিম জেনারেটর নভেম্বরে স্থাপন হয়েছে। রিয়্যাক্টর পাওয়ার ভেসেল থেকে ষ্টিম জেনারেটর পর্যন্ত পাইপ লাইনের গুরুত্বপূর্ণ ওযেল্ডিং কাজ চলামান। টার্বাইন বিল্ডিংয়ে ১৬ মিটার পর্যন্ত সিভিল কনসট্রাকশন শেষ হয়েছে। ১৬ মিটার হতে ৪১ মিটার পর্যন্ত ৩৯টি কলামের মাধ্যমে মেটাল কন্সট্রাকশনের কাজও চলমান।

ইউনিট-২:

প্রথম ইউনিটের সাথে সাথে ২য় ইউনিটের কাজও সমান গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নেয়া হচ্ছে। সিডিউলের নির্ধারিত সময়ের আগেই এই ইউনিটের অনেক কাজ শেষ হচ্ছে। ডিসেম্বরেই ইনার কনটেইনমেন্ট ভবনের ঢালাই ৩৮ মিটার হতে ৪৩ মিটার পর্যন্ত শেষ হয়েছে। এর ওপরেই ডোম স্থাপন করা হবে। এরআগে এপ্রিলে বাবলার ট্যাংক এবং নভেম্বরে পোলার ক্রেন স্থাপন করা হয়। এই ইউনিটে অবজিলারি বিল্ডিংয়ের কাজও দ্রুত গতিতেই এগিয়ে চলেছে।

দুই ইউনিটের জন্য ৪টি কুলিং টাওয়ার নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। প্রতিটি কুলিং টাওয়ারে ১০০টি র‌্যাকার কলাম স্থাপন করা হয়। এগুলো ১৭৫ মিটার উচ্চতা সম্পন্ন।

এদিকে ২০২১ সালে ট্রেনিং সেন্টারে সর্বাধুনিক রিয়্যাক্টর সিম্যুলেটর স্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে কমিশনের বিদেশে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রকৌশলীরা নিয়মিত প্র্যাকটিস করে অধিকতর দক্ষতা অর্জন করছে।