অত্যন্ত জরুরী হলেও

ঈশ্বরদী বিমানবন্দর চালুর দাবি উপেক্ষিত

ডেইলি ভিশন টুয়েন্টিফোর অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ৯:৫১ পূর্বাহ্ণ, জুন ১৩, ২০২১

ঈশ্বরদী বিমানবন্দর চালু করা অত্যন্ত জরুরী। জনপ্রতিনিধি, বিদেশী নাগরিক, দেশের বেসরকারি এয়ারলাইন্স, পাবনা জেলা প্রশাসন ও ঈশ্বরদীবাসীর দীর্ঘদিনের দাবির পরও চালু হচ্ছে না বিমানবন্দরটি। বিমানবন্দর চালুর দাবি উপেক্ষিত হওয়ায় সময়ের অপচয়, বিড়ম্বনা, নিরাপত্তাহীনতা ও অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে বলে ভূক্তভোগীরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন। এটি চালু হলে স্থানীয় ও বিদেশী নাগরিক, ব্যবসায়ী ও এয়ারলাইন্স ব্যবসায়ী সকলেই লাভবান হবে। পাশাপাশি সরকারেরও রাজস্ব আয় হবে বলে মনে করছেন তারা।

Dailyvision24.com

সর্বশেষ ২০১৪ সালে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের বিমান নেমেছিল ঈশ্বরদী বিমানবন্দরে। এরপর আর কোনো যাত্রীবাহী ফ্লাইট অবতরণ করেনি। প্রায়ই নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে হেলিকপ্টার ভাড়া করা উঠানামা করতে দেখা যায়। বিমান বন্দর চালু না থাকায় রাশিয়ানসহ অন্যান্য বিদেশী ও দেশের গুরুত্বপূর্ণ পদস্থ কর্মকর্তারা জরুরী প্রয়োজনে বিপুল টাকা খরচ করে হেলিকপটার ভাড়া করে বাধ্য হয়েই ঈশ্বরদী আসছেন। আবার মিটিং বা পরিদর্শন শেষ করে ঢাকায় ফিরে যাচ্ছেন। একই অবস্থা ইপিজেড-এর বিদেশী বিনিয়োগকারীদের। বিমান বন্দর থাকা সত্বেও বিমান উঠানামা না করায় সকলে তিক্ত ও বিরক্ত । অর্থাৎ ঈশ্বরদী বিমান বন্দর চালু অতীব জরুরী একটি ইস্যু এবং সময়ের দাবি হওয়া সত্বেও চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে না।

বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের নথি থেকে জানা যায়, ১৯৪০-১৯৪৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে ঈশ্বরদী বিমানবন্দরটি স্থাপিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনী বিমানবন্দরটি ১৯৪৫ সালে ব্যবহার করেছিল। পরে ১৯৬০ সালে নিয়মিত বিমান চলাচলের জন্য ঈশ্বরদী বিমানবন্দরের কাজ শুরু হয়। ১৯৬৬ সালে কংক্রিটের রানওয়ে তৈরির পর ডিসি-৩ ও এফ-২৭ বিমান উঠা-নামা করতো। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বিমানবন্দরটি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ১৯৭২ সালে মেরামতের পর ঈশ্বরদী-ঢাকা-ঈশ্বরদী রুটে বিমান চালু করা হয়। একসময়ে এখানে সকাল ও বিকাল দুটি ফ্লাইট চলাচল করতো। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত নিয়মিত এ বিমানবন্দরে ফ্লাইট পরিচালনা করত।

Dailyvision24.com

১৯৮৭ সালে লোকসানসহ নানা অজুহাতে প্রথম বিমানবন্দরটি বন্ধ করে দেয়া হয়। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর প্রায় ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কার করে ১৯৯৪ সালে বিমানবন্দরটি আবার চালু করা হয়। দীর্ঘ ১৭ বছর পর ২০১৩ সালে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ ঈশ্বরদী বিমানবন্দর থেকে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করে। কিন্তু ৬ মাস ১১ দিন চালু থাকার পর ২০১৪ সালের ২৯ মে আবার বন্ধ হয়ে যায় এটি। গত সাত বছরে এই বিমানবন্দরে কোনো যাত্রীবাহী ফ্লাইট ওঠা-নামা করেনি। তবে মাঝেমধ্যে হেলিকপ্টার ও বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমানগুলোকে এটি ব্যবহার করতে দেখা যায়।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পসহ বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্প ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে ঈশ্বরদী ইপিজেড, বাংলাদেশ সুগারক্রপ রিসার্চ ইনস্টিটিউট, আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, ডাল গবেষণা কেন্দ্র, পাবনা সুগার মিল, রেলওয়ের পাকশী বিভাগীয় অফিস, আলহাজ্ব টেক্সটাইল মিল, সহস্রাধিক হাসকিং চাল কল, অটো রাইস ও ফাওয়ার মিল, অয়েল মিল উল্লেখযোগ্য।

বতর্মানে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, ইপিজেডসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে প্রায় চার সহস্রাধিক বিদেশী কর্মরত রয়েছেন। প্রতিনিয়ত বিদেশীদের ঢাকা ও চট্টগ্রামে যাতায়াত করতে হচ্ছে। রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পে দেশী- বিদেশী ভিভিআইপি মন্ত্রী ও কর্মকর্তা নিত্য যাতায়াত করছেন। কোন কোন ক্ষেত্রে বিপুল অর্থ ব্যয় করে বেসরকারী হেলিকপ্টার ভাড়া করে যাতায়াত করতে দেখা গেছে। সড়কপথে ঈশ্বরদী হতে ঢাকা যেতে যানজটের কারণে বর্তমানে ৭-১০ ঘন্টা সময় লাগে। ট্রেনের টিকেট প্রাপ্তিতে সমস্যা ছাড়াও সময় লাগে ৫ ঘন্টা আবার ট্রেন লেট হলে আরো বেশী। এই অবস্থায় একদিকে সময়ের অপচয়, বিড়ম্বনা এবং হেলিকপ্টার ভাড়ার কারণে সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থেরও অপচয় হচ্ছে। অথচ ঈশ্বরদী বিমানবন্দর চালু থাকলে অর্থ ও সময়ের অপচয় সাশ্রয়ের পাশাপাশি ইপিজেডসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিদেশী বিনিয়োগ বাড়বে। আর উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা এখানকার কাজ শেষ করে ওইদিনই ঢাকায় ফিরে আবার অফিসের কাজে যোগ দেয়ার সুযোগ পাবেন।

Dailyvision24.com

এলাকার সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুজ্জামান বিশ্বাস বিমানবন্দর চালু সময়ের দাবি জানিয়ে বলেন, বিগত সংসদ অধিবেশনে আমি বিমানবন্দর দ্রুত চালুর জন্য বলেছি। বাজেট বক্তৃতার সময়ও বিষয়টি আবারো সংসদে উত্থাপন করবো।

রাশিয়ার জেএসসি এএসই’র ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং রূপপুর প্রকল্পের রাশিয়ান প্রকল্প পরিচালক এলেক্সি ডেইরি ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমরা ঢাকা-ঈশ্বরদীর মধ্যে বিমান সংযোগ স্থাপনের ধারণাকে সমর্থন করি। এটি আমাদের লোকদের মূল্যবান সময় বাঁচাতে এবং ঝামেলা এড়াতে সহায়তা করবে।’

উপজেলা নির্বাহী অফিসার পি এম ইমরুল কায়েস জানান, জরুরীভাবে বিমানবন্দর চালুর বিষযে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে একাধিকবার উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে গুরুত্ব উল্লেখ করে বলা হলেও কোন অগ্রগতি নেই।

ঈশ্বরদী শিল্প ও বনিক সমিতির সভাপতি শফিকুল ইসলাম বাচ্চু বলেন, ঈশ্বরদী বিমানবন্দরটি চালু হলে অবশ্যই দেশি-বিদেশি শিল্পোদ্যোক্তারা এখানকার ইপিজেডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আরও বেশি বিনিয়োগ করতে পারবেন। সড়কপথে এখানে আসতে অনেক সময় লাগে। আকাশপথের সুযোগ থাকলেও উদ্যোগের অভাবে উদ্যোক্তারা এখানে বিনিয়োগের আগ্রহ হারাচ্ছেন।

রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের সাইট ইনচার্জ রুহুল কুদ্দুস বলেন, বিমানবন্দরটি চালু না থাকায় এখানে কর্মরত প্রায় চার হাজার বিদেশি নাগরিক বিশেষ করে রাশিয়ানদের সড়ক ও রেলপথে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। রাশিয়া থেকে বিমানে ঢাকায় নামার পর সড়কপথের যানজটে নাজেহাল হতে হচ্ছে তাদের। এ কারণে দ্রুত বিমানবন্দরটি চালু করা প্রয়োজন।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, ঈশ্বরদী বিমানবন্দরটি ৪১২ একর জায়গার ওপর তৈরি। এর রানওয়ের দৈর্ঘ্য চার হাজার ৭০০ ফুট, প্রস্থে ৭৫ ফুট। বর্তমানে যে ধরনের উড়োজাহাজ (ড্যাশ- ৮, এটিআর) বাংলাদেশের এয়ারলাইন্সগুলো ব্যবহার করে. সেগুলো অবতরণের জন্য ঈশ্বরদী বিমানবন্দর উপযুক্ত নয়। রানওয়ের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ আরও বাড়ানো এবং উন্নত করা প্রয়োজন। এছাড়া বিমানবন্দরটির ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং এর সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টির ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। এজন্য মোটা অঙ্কের অর্থ ব্যয় হবে।

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) কামরুল ইসলাম জানান, বর্তমানে ঈশ্বরদীতে যে রানওয়েটি রয়েছে সেখানে বাংলাদেশের এয়ারলাইন্সগুলোর বহরে থাকা অত্যাধুনিক এয়ারক্রাফটগুলোর অবতরণের সুযোগ নেই। ঈশ্বরদী বিমানবন্দরের কিছু উন্নয়নমূলক কাজ করতে হবে। যদি বাংলাদেশের অন্যান্য অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরের মতো সুযোগ-সুবিধা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা যায় তাহলে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স এ রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করবে।