ব্লগার অনন্ত বিজয় হত্যার ঘটনায় ৪ আসামির মৃত্যুদণ্ড

ডেইলি ভিশন টুয়েন্টিফোর অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ৫:৩০ অপরাহ্ণ, মার্চ ৩০, ২০২২

সিলেট লেখক ও ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশ হত্যা মামলার রায়ে চারজনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছেন আদালত। এ মামলায় আরেকজন খালাস পেয়েছেন। বুধবার (৩০ মার্চ) দুপুরে সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনাল সিলেটের বিচারক নুরুল আমীন বিপ্লব এ রায় ঘোষণা করেন। আদালতের মামলার আইনজীবীরা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তিনি বলেন, রায়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্তরা হলেন- সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার আবুল হোসেন (২৫), উপজেলার খালপাড় তালবাড়ির ফয়সাল আহমদ (২৭), সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের বিরেন্দ্রনগরের (বাগলী) মামুনুর রশীদ (২৫) ও কানাইঘাটের ফালজুর গ্রামের আবুল খায়ের রশীদ আহমদ (২৫)। এছাড়া বিতর্কিত ব্লগার সাফিউর রহমান ফারাবীকে মামলা থেকে অব্যহতি দেওয়া হয়েছে।

ট্রাইব্যুনালের রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর আইনজীবী মুমিনুর রহমান টিটু বলেন, রায় ঘোষণার সময় আবুল খায়ের রশীদ আহমদ এবং সাফিউর রহমান ফারাবী উপস্থিত ছিলেন। মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত অপর ৩ আসামি পলাতক ছিলেন।

মামলা সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সালের ১২ মে সিলেট নগরের সুবিদবাজারে নুরানি আবাসিক এলাকার নিজ বাসার সামনে অন্তত বিজয়কে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

পেশায় ব্যাংকার অনন্ত বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখির পাশাপাশি যুক্তি নামে বিজ্ঞানবিষয়ক একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। এছাড়া বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। পুলিশের অভিযোগপত্র মতে, লেখালেখির কারণে উগ্রবাদী গোষ্ঠীই তাকে হত্যা করেছে।

দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া শেষে আজ এ মামলার রায় দেওয়া হলো বলে অনন্ত বিজয় হত্যা মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী প্যানেলের সদস্য মোহাম্মদ মনির উদ্দিন জানিয়েছেন।

হত্যা যেভাবে সংঘঠিত

২০১৫ সালের ১২ মে, প্রতিদিনের মতো ওইদিনও অফিসে যাওয়ার জন্য সকালে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন ব্যাংক কর্মকর্তা অনন্ত বিজয় দাশ। সিলেট নগরের সুবিদবাজারের দস্তিদার পাড়ায় তার বাসা। বাসা থেকে বের হয়ে মূল সড়কে আসার পরপরই আগে থেকে ওৎপেতে থাকা দুর্বৃত্তরা তাড়া করেন তাকে। প্রাণভয়ে দৌড় দেন অনন্ত বিজয়। বাড়ির পাশে দিঘির সামনে যাওয়ার পরই দুর্বৃত্তরা নাগাল পেয়ে যায় তার। সেখানেই কুপিয়ে জখম করা হয় তাকে।

এ সময় অনন্তের চিৎকার শুনে বাসা থেকে বেরিয়ে আসেন তার বোন। তিনি কান্না করে অনন্তকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য সাহায্য প্রার্থনা করেন। কিন্তু ভয়ে কেউ এগিয়ে আসেনি। পরে ভাইবোন মিলে অনন্তের ক্ষতবিক্ষত দেহ নিয়ে যান সিলেট এমএজি ওসমানী হাসপাতালে। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী অনন্ত বিজয় হত্যার প্রতিবাদে পরের দিন সিলেটের হরতাল ডাকে যুদ্ধাপরাধীর বিচারের দাবিতে গঠিত এই মোর্চা।

মামলার তদন্ত ও বিচার

হত্যাকাণ্ডের পরদিনই অনন্তের বড় ভাই রতেশ্বর দাশ বাদী হয়ে সিলেট বিমানবন্দর থানায় অজ্ঞাতপরিচয় চারজনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেন। মামলার এজাহারে বলা হয়, বিজ্ঞান বিষয়ে লেখালেখির কারণে অনন্তকে ‘উগ্র ধর্মান্ধ গোষ্ঠী’ পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে।

প্রথমে মামলাটি পুলিশ তদন্ত করলেও পরে তা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) স্থানান্তরিত হয়। সিআইডির পরিদর্শক আরমান আলী তদন্ত করে ২০১৭ সালের ৯ মে সম্পূরক অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেন। এতে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক ১০ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করে ছয়জনকে অভিযুক্ত করা হয়।

অভিযুক্তরা হলেন- সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার আবুল হোসেন, খালপাড় তালবাড়ির ফয়সাল আহমদ, সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের বিরেন্দ্রনগরের (বাগলী) মামুনুর রশীদ, কানাইঘাটের পূর্ব ফালজুর গ্রামের মান্নান ইয়াইয়া ওরফে মান্নান রাহী ওরফে এ বি মান্নান ইয়াইয়া ওরফে ইবনে মঈন, কানাইঘাটের ফালজুর গ্রামের আবুল খায়ের রশীদ আহমদ এবং সিলেট নগরের রিকাবীবাজার এলাকার সাফিউর রহমান ফারাবী ওরফে ফারাবী সাফিউর রহমান।

তাদের মধ্যে ফারাবী ব্লগার অভিজিৎ রায় হত্যা মামলার দন্ডপ্রাপ্ত আসামি। অভিযুক্ত আসামিদের মধ্যে মান্নান রাহী আদালতে অনন্ত হত্যার দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।

২০১৭ সালের ২ নভেম্বর মান্নান হঠাৎ অসুস্থ হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। আসামিদের মধ্যে আবুল হোসেন, ফয়সাল আহমদ ও মামুনুর রশীদ পলাতক রয়েছেন।

এই মামলায় সাক্ষী ছিলেন ২৯ জন। তবে, সাক্ষীদের আদালতে হাজির করতে না পারায় বারবার পিছিয়ে যায় মামলার শুনানি। অন্তত ১৫ দফা পেছায় মামলার শুনানি। এছাড়া করোনার কারণেও দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল মামলার কার্যক্রম। অবশেষে মামলাটি দ্রুত শেষ করতে মহানগর দায়রা জজ আদালত থেকে সন্ত্রাস বিরোধী ট্রাইব্যুনালে নেওয়া হয় এর কার্যক্রম। এতে গতি আসে মামলার কার্যক্রমে।

সিলেটের সরকারি কেশৈলী নিজাম উদ্দিন জানান , এই মামলার ছয়জন আসামির মধ্যে তিনজনকে গ্রেফতার করতে পেরেছে পুলিশ। বাকি তিনজনকে গ্রেফতার করতে পারেনি। তিনজনকে পলাতক রেখেই এ মামলার বিচার ঘোষণা করা হয়।