পাবনা প্রেসক্লাবের ৬০ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে রণেশ মৈত্র প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক, পাবনা প্রেসক্লাব

ডেইলি ভিশন টুয়েন্টিফোর অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১:৫৪ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৩০, ২০২১

আজ পহেলা মে। ১৯৬১ সালের এই দিনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো পাবনা প্রেসক্লাব। সাংবাদিক পাবনাতে তখন আমরা মাত্র তিনজন। প্রয়াত এ.কে.এম. আজিজুল হক, প্রয়াত আনোয়ারুল হক ও আমি। সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এ.কে.এম. আজিজুল হককে-আর সম্পাদকের দায়িত্ব আমাকে।
একেএম আজিজুল হকের তৎকালীন দ্বিতল বাসভবনের নীচ তলায় ছিল তাঁর বৈঠকখানা। ঐ বৈঠকখানাটির দরজার সামনেই “পাবনা প্রেসক্লাব” মর্মে একটি সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দিয়ে ফিতা কেটে এই দিনে আমাদের প্রেসক্লাবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেছিলেন পাবনার তদানীন্তন সাংবাদিক-ঘনিষ্ঠ জেলা প্রশাসক।
ক্লাবটির নানা পদে ডাঃ অব মেজর মোফাজ্জল হোসেন শহীদ মওলানা কছিম উদ্দিন, হিমাংসু কুমার বিশ্বাস, আরিফ সহ আরও অনেকে ছিলেন। দুঃজনক যে স্মৃতি বিভ্রমের কারণে আজ আর তাঁদের নাম স্মরণে আনতে এবং এই নিন্ধে উল্লেখ করতে পারলাম না। তবে পূর্ব বর্ণিত হিনজন বাদে সবাই ছিলেন অসাংবাদিক।
পাবনাতে সাংবাদিকের সংখ্যা তখন এত কম ছিল কেন-এ প্রশ্নটি উঠতেই পারে কারণ পাবনা তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের মোট ১৭টি জেলার মধ্যে একটি প্রাচীন জেলা। সিরাজগঞ্জ তখন ছিল পাবনা জেলার অন্যতম মহকুমা। তবুও তিনজন মাত্র সাংবাদিক ছিলেন তখন । এ কারণে যে পাকিস্তান সৃষ্টির পর সংবাদ পত্র প্রকাশনার প্রধান শহর হয়ে দাঁড়ায় ঢাকা। সুরুতে সেখান থেকে দৈনিক আজাদ, মর্নিং নিউজ, পরে সংবাদ, ইত্তেফাক ও পাকিস্তান অবজার্ভার নামে কয়েকটি দৈনিক সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। “সংবাদ” এর পাবনা প্রতিনিধি ছিলাম আমি। বাদ-বাকী সব পত্রিকার সংবাদ দাতা ছিলেন এ কে এম আজিজুল হক। এই দুই সাংবাদিক মিলেই আমাদেরকে দায়িত্ব নিতে হয়েছিল পাবনাতে “পূর্ব পাকিস্তান মফ:স্বল সাংবাদিক সম্মেলন” অনুষ্ঠানের। আজিজুল হক তখন এডরুক লেবরেটরীর অফিসে কাজ করতেন। সকাল-সন্ধ্যা সেখানেই থাকতে হতো তাঁকে। আর আমি তো বেকার তাই সম্মেলনের একমাত্র সার্বক্ষণিক কর্মী। হক সাহেবের বৈঠক খানায় এসে রোজ বেলা নয়টা দশটায় বসতাম-বিকেল তিনটের দিকে খেতে যেতাম বাসায় পাঁটায় আবার এসে ঐ বৈঠকখানায় বসতাম-থাকতাম রাত নয়টা পর্য্যন্ত।সারাদিন পেতাম না হক সাহেবকে-তাই একাই কাজ করতে হতো।
এই একাকীত্বদূর করার জন্য প্রয়োজন হয় সাংবাদিকের সংখ্যা বাড়ানোর। কিন্তু সব পত্রিকা তো হক সাহেবের দখলে। এমতাবস্থায় স্থির করলাম বাল্যবন্ধু আনোয়ারুল হককে কোন পত্রিকায় নিয়োগপত্র আনিয়ে সাংবাদিকতায় নামানো যায় কি না। ইত্তেফাকের তৎকালীন বার্তা সম্পাদক শহীদ সিরাজউদ্দিন হোসেন আমার সুপরিচিত। ল্যা-ফোনে আমি তাঁকে একদিন অনুরোধ জানালাম ইত্তেফাকের পাবনাস্থ সাংবাদ দাতা আনোয়ারুল হককে দিতে। তিনি বললেন, দুটি সমস্যা। একটি হলো আনোয়ারুল চিনি না। দ্বিতীয়ত: আজিজুল হক সাহেব ইত্তেফাক ছাড়াতে সম্মত হবেন কি না।
উত্তরে বললাম, সিরাজভাই, আনোয়ারুল হক আমার বাল্যবন্ধু-ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী। আপনি চাইলে আমিটেলিফোনে তার সাথে আপনার কথা বলিয়ে দেব। আর আজিজুল হক সাহেব? আমি তাঁর বিরুদ্ধে নই। তবে তিনি একাই সংবাদ ছাড়া সকল পত্রিকার পাবনাস্থ সংবাদদাতা কাজে ভারাক্রান্ত। বললে তিনি রাজী হবেন আশা করি। এ ব্যাপারে আপনার সহযোগিতা চাই। সিরাজ ভাই বললেন, ঠিক আছে আনোয়ার সাহেবকে বলবেন আমার সাথে কথা বলতে। সিরাজ ভাই এর সাড়া ইতিবাচক হওয়াতে বিকেলে আনোয়ারকে সাংবাদিকতায় আসতে রাজী করিয়ে সন্ধ্যার পর হক সাহেবকে অনুরোধ করলাম ইত্তেফাক আনোয়ারকে দিতে। তিনি বললেন ইত্তেফাক অফিস রাজী হবে কি? আমি বললাম, প্রাদেশিক সাংবাদিক সম্মেলন মাত্র দুইজন সাংবাদিককে দিয়ে করা কত কঠিন তাতো বুঝছেন। সাংবাদিকের সংখ্যা তাই বাড়ানো অপরিহার্য্য হয়ে পড়েছে। ইত্তেফাকের বার্তা সম্পাদককে ঐ সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে-তাই তাঁকে বললে তিনি রাজী হবেন। কাকে ইত্তেফাকে নিতে চান? প্রশ্ন করলেন হক সাহেব। বললাম আমার বন্ধু আনোয়ারুল হক। সম্মতি সরাসরি না দিয়ে হক সাহেব বললেন, দেখি সিরাজ সাহেব কি বলেন।
পরদিন সকালে হেড পোষ্ট অফিসে গিয়ে টেলিফোনে সিরাজউদ্দিন সাহেবের সাথে হক সাহেবকে কথা বলালে বিষয়টা চূড়ান্ত হলো। কিছু দিনের মধ্যেই আনোয়ারের নিয়োগপত্র এসে যার ইত্তেফাক থেকে।
পরবর্তীতে আমার লম্বা জেল জীবন। এক পর্য্যায়ে আনোয়ার সহ অন্যান্যরা তৎকালীন এক ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেটকে ধরে বর্তমান প্রেসক্লাব (অর্পিত সম্মতি) সরকারের কাছ থেকে নিজ গ্রহণ করে। ইতোমধ্যে নানা ধনাঢ্য ব্যক্তির আর্থিক সহযোগিতায় ক্লাবের যথেষ্ট উন্নয়ন সাধিত হয়েছে।
তিন জন সাংবাদিক দিয়ে যে প্রেসক্লাবের ১৯৬১ সালে যাত্রা শুরু সেই প্রেস ক্লাবে ধীরে ধীরে কমরেড প্রসাদ রায়, শফি আহমেদ মীর্জা শামসুল ইসলাম, হাসনাতুজ্জামান, অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু ও শাহাবুদ্দিন চুন্নু (উভয়কে জীবন সদস্য পদ দেওয়া হয়), আবদুল মতিন খান, শিবজিত নাগ এবিএম ফজলুর রহমান, আবদুর রশীদা আবদুল আউয়াল, সৈকত, মুস্তফা সতেজ, নরেশ মধু, কৃষ্ণ ভৌমিক, কানু সান্যাল, সুশীল তরফদার, উৎপল মীজা, রুমী খোন্দকার সহ আরও অনেকে। তালিকা আরও দীর্ঘ। অনেককে আমরা ইতোমধ্যে হারিয়েছি আবার অনেকের নাম তাৎক্ষণিকভাবে স্মরণে না আসার অনুল্লেখিত রইলো। তবে সকলের সম্মিলিত অবদানে ক্লাবটি সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে-তবে সদস্যদের কাছে আরও অনেক প্রত্যাশিত রয়েছে।
প্রথম প্রত্যাশা হলো সাংবাদিকতায় নীতি নিষ্ঠতা। নীতির প্রশ্নে কোন আপোষ কখনও না করা;
দ্বিতীয়ত: অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার উপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করা;
তৃতীয়ত: অর্থ বিত্তের স্তাবকতা নয় শোষিত-বঞ্চিতের যৌক্তিক সমস্যা ও দাবী দাওয়া দ্বিধাহীনভাবে তুলে ধরা;
চতুর্থত: যেহেতু সাংবাদিকতার নিধাবিত্ত ক্ষেত্র পাবনা-তাই পাবনার সার্বিকসমস্যা নিষ্ঠার সাথে তুলে ধরা;
পঞ্চমত: অন্তত: আরও ২০/২৫ জন প্রেসক্লাবের সদস্যপদ পাওয়ার দাবীদার। দ্রুত তাঁদের সকলকে সদস্যপদ প্রদান করা;
ষষ্ঠত: প্রেসক্লাবের আরও নানাবিধ উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া প্রয়োজন। যেমন লাইব্রেরী। লাইব্রেরী নিয়মিত খোলা ও বন্ধ করাই শুধু নয়, সাংবাদিতা সংক্রান্ত নানা বই, সাংবাদিকদের লেখা সকল বই, পাবনার লেখক-লেখিকাদের সকল বই, বহুসংখ্যাক ডিকশনারী সংগ্রহ করা ও পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা;
সপ্তমত: আর একটি চোট কিন্তু আধুনিক সেমিনার রুম গড়ে তোলা যার পাঁচ ঘন্টার, যেমন, ১০টা-৩টা ও বিকেল ৫টা রাত ১০টা, ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা ভাড়ায় প্রার্থীদেরকে দেওয়ার ব্যবস্থা করা; ফলে ক্লাবের আয় কিছুটা বৃদ্ধি পাবেন। এই রুমে ৩০/৪০ টি চেয়ার ও একটি ছোট ডায়াস রাখা যেতে পারে।
অষ্টমত: ক্লাবটির মালিকানা প্রেসক্লাবের হাতে আনার জন্য মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রী পর্য্যায়ে চেষ্টা জোরদার করা;
নবমত: সদস্যদের মাসিক চাঁদা, ভর্তি ফি ও কল্যাণ তহবিলের চাঁদা অন্তত: পক্ষে দ্বিগুণ করা;
দশমত: গঠনতন্ত্রের গণতন্ত্রায়ন ও বাৎসরিক সাধারণ সভা বাধ্যতামূলক করা।
পাবনা প্রেসক্লাবের ৬০ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে এগুলিই হোক আমাদের আকাংখা।
লেখক
রণেশ মৈত্র
সাংবাদিকতায় একুশে পদক প্রাপ্ত