ঈশ্বরদী ২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ । ১১ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | বাংলা English

বরেণ্য নেতৃবৃন্দের ভোজন

ডেইলি ভিশন টুয়েন্টিফোর অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: জুলাই ২৪, ২০২০

পনেরো বছর বয়স তখন আমার। ভর্তি হয়েছি অষ্টম শ্রেণিতে পাবনা গোপাল চন্দ্র ইনস্টিটিউশনে ১৯৪৮ সালে। ওই বছরেই মার্চে ভাষা আন্দোলনের শুরু। বুঝে না-বুঝে ওই পনেরো বছর বয়সেই রাজনীতির অঙ্গনে পা ফেলতে শুরু করি।

রাজনীতির জীবনবৃত্তান্ত বা ইতিহাস এই নিবন্ধের আলোচ্য বিষয় না হওয়ায় সে দিকটা এই লেখায় অত্যন্ত প্রাসঙ্গিকটুকু ব্যতীত স্থান পাবে না।

পাকিস্তান আমল সবে শুরু হয়েছিল তখন, কিন্তু যাত্রালগ্ন থেকে আজতক সে দেশে গণতন্ত্রের নাম-নিশানাটুকুও চোখে পড়েনি নাগরিকদের। আমরা ছিলাম পূর্ব পাকিস্তানের বাসিন্দা। জাতীয়তায় বাঙালি। পশ্চিম পাকিস্তানের চক্ষুশূল। তাই বাঙালি জাতি এবং তার অবিসংবাদিত নেতৃবৃন্দ গণতন্ত্র ও গণতন্ত্রের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট নানা দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। ছাত্র সমাজই ছিল ওই আন্দোলনগুলো গড়ে তোলার প্রধান অবলম্বন। ছাত্র হিসেবে আমিও তাতে ওই আটচল্লিশ সাল থেকেই জড়িয়ে পড়ি।

আর সে কারণেই আমার সুযোগ হয়েছে তৎকালীন বরেণ্য জাতীয় নেতৃবৃন্দের ভোজন দৃশ্য দেখার। এরা হলেন- শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী ও শেখ মুজিবুর রহমান, আমাদের প্রিয় মুজিব ভাই এবং অধ্যাপক মোজাফ্‌ফর আহমেদ।

ভোজনে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক:তখন পাবনা সদর (পাবনা-৫) আসনে মনোনয়ন পান কৃষক শ্রমিক পার্টির প্রার্থী আবদুল গফুর। শেরেবাংলা বিভাগোত্তর পাবনায় ওই প্রথম এলেন তার দলীয় প্রার্থীর সপক্ষে নির্বাচনী জনসভা অনুষ্ঠানের জন্য। থাকলেন পাবনা সার্কিট হাউসে। বিশাল জনসভা অনুষ্ঠিত হলো পাবনা স্টেডিয়াম ময়দানে।

যেমন উঁচু, লম্বা, ভারী ওজনের দেহ শেরেবাংলার, তেমনই উঁচু মাপের আয়োজন ব্রেকফাস্টের। বাড়িতে কাজের লোক বেশি না থাকায় ভেতর থেকে প্লেট, গ্লাস, খাবার যা যা তৈরি হয়েছে সেগুলো এনে আমরাই পরিবেশন করছিলাম। চীনামাটির এক বিশাল প্লেট শেরেবাংলার সামনে আর টেবিলে এক পাত্রে ডজন দুই বড় সাইজের ঘিয়ে ভাজা পরোটা, বড় এক পাত্রে প্রচুর পরিমাণে মুরগির মাংস, ২৪টা সিদ্ধ ডিম, এক ছড়া বড় সবরিকলার কথা মনে আছে। ভাবছিলাম অত বেশি বয়সের মানুষ এত খাবার খেতে পারবেন না।

কিন্তু না। পরোটাগুলো এক এক করে হাতে তুলে ছিঁড়ে টুকরোগুলো মুখে পুরছেন অতঃপর মাংস, এক এক করে সিদ্ধ ডিম মুখে পুরছেন, সেগুলো শেষ করে কলা ১০-১২টা। যা যা আনা হয়েছিল তার কোনো কিছুই প্রায় অবশিষ্ট থাকেনি। আজ এমন ভোজন কথা সবার কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হবে। তবে যেহেতু চোখে দেখেছি, তাই হুবহু বর্ণনা করলাম। দীর্ঘ দেহ ফলে বিরাট হা। তাই যা মুখে দিচ্ছেন সবই গিলে খাওয়ার মতো খেয়ে ফেলছেন।

ভাবলাম ব্রেকফাস্ট এমন হলে লাঞ্চ, ডিনার বা কেমন! এটা ১৯৫৪ সালের কথা।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী: ১৯৬২ সাল। আমি তখন দৈনিক সংবাদের পাবনা সংবাদদাতা। সংবাদ অফিস থেকে টেলিগ্রামে আমাকে জানানো হয়েছিল এনডিএফ নেতাদের উত্তরবঙ্গ সফর কভার করার জন্য। মুজিব ভাই পাবনার জনসভা শেষে বললেন, সংবাদ তাকে জানিয়েছে, আমি তাদের সঙ্গে যাব। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আমি প্রস্তুত কিনা। আমি জানালাম, আমি প্রস্তুত।

নেতৃবৃন্দের মধ্যে ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেখ মুজিবুর রহমান, আবু হোসেন সরকার, মাহমুদ আলী, যাদু মিয়া প্রমুখ। ঢাকা থেকে সাংবাদিক এসেছিলেন দু’জন। একজন ইত্তেফাক থেকে, অন্যজন বার্তা সংস্থা পিপিআই (পাকিস্তান প্রেস ইন্টারন্যাশনাল) থেকে। আমি খবর পাঠাতাম প্রেস টেলিগ্রামে, তারা টেলিফোনে (ল্যান্ডফোন)।

ট্রেন গিয়ে থামল সান্তাহার স্টেশনে। সোহরাওয়ার্দী সাহেব এক কামরায়, অন্য নেতৃবৃন্দ অন্য এক কামরায়, আমরা সাংবাদিক তিনজন অন্য কামরায়। অতঃপর সান্তাহার। সেখানে জনসভা বিকেলে। দুপুরে ওখানেই লাঞ্চের আয়োজন। এই প্রথম নেতৃবৃন্দের সঙ্গে একত্রে খাওয়ার ব্যবস্থা।

চেয়ে দেখি সব রিচ ফুড, যেমন- পোলাও, দু’রকমের মাংস, মাংসের চপ, দই, মিষ্টি ইত্যাদির আয়োজন। পরিবেশনকারীরা সোহরাওয়ার্দী সাহেবের পাতে কোনো আইটেম একটু কমে এলেই আবার দিচ্ছেন; কিন্তু সোহরাওয়ার্দী সাহেব বিন্দুমাত্র আপত্তি না করে বেমালুম সবই খেয়ে যাচ্ছেন। শেরেবাংলা ছিলেন প্রায় প্রাচীন যুগের নেতা- যে যুগে খাবারের প্রতিযোগিতা চলত। সর্বাধিক যিনি খেতে পারতেন তিনি পুরস্কৃত হতেন। ছোটবেলায় দেখেছি পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের কেমিস্ট্রির শিক্ষক ডা. মনীন্দ্র মজুমদার এমন এক প্রতিযোগিতায় ৮০টি বড় বড় পানতুয়া খেয়ে পুরস্কৃত হলেন। এগুলো অনেকটা ফিউডাল যুগের ব্যাপার।

কিন্তু আধুনিক যুগের পাশ্চাত্য অনুরাগী সোহরাওয়ার্দী সাহেব অমন খাবেন- কেউই আমরা ভাবতে পারিনি।

জনসভা শেষে আবার ট্রেনযোগে পার্বতীপুর। সেখানেই রাত্রিবাস। ডিনারের ব্যাপক আয়োজন। আমরা তো ভয় পাচ্ছি আবারও রিচ খাবার খেতে হবে কিনা। ঠিক তাই। স্থানীয় নেতারা কোথায় কত রিচ খাবারের আয়োজন করবেন- তার প্রতিযোগিতা যেন। আবারও সোহরাওয়ার্দী সাহেবের খাবারটা দেখব। প্রচণ্ড রিচ ফুড এবং একই ধরনের আয়োজন- খেলেনও প্রচুর পরিমাণে।

আমরা তিন সাংবাদিক সাদা ভাত আর মাছের আয়োজন থাকলে দিতে বললাম। কিন্তু তা না থাকায় ওই খাবারই খেলাম সামান্য পরিমাণে।

মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী :মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর প্রচণ্ড ভক্ত ছিলাম। অবশ্য ‘৬২-র পর থেকে তার চীন সমর্থক (আইয়ুবের প্রতি দুর্বল এবং পরবর্তী সময়ে ছয় দফা বিরোধিতা) রাজনীতির কারণে রাজনৈতিক ব্যবধান রচিত হলেও তার দেশপ্রেম নিয়ে আজও আমার মনে কোনো প্রশ্ন নেই। সম্ভবত ১৯৫৭ সালের গোড়ার দিকে আওয়ামী লীগ সভাপতি হিসেবে মিসরের কর্নেল নাসেরের আমন্ত্রণে তিনি কায়রো গেলেন। বিপুল সংবর্ধনা পেলেন কায়রো বিমানবন্দরে। তাকে রাখা হলো আন্তর্জাতিক মানের হোটেল ‘আলেকজান্দ্রা’য়।

হঠাৎ একদিন পাবনার বাসায় ডাকযোগে একটি চিঠি পেলাম কায়রো থেকে। খুলে দেখি মওলানা ভাসানীর নিজ হাতে লেখা। দুর্ভাগ্য, চিঠিটি আজ নেই।

যাহোক তিনি লিখেছেন, দেশে ফিরে তিনি জানাবেন। আমি যেন রংপুর জেলার মাইনকার চরে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করি। অনেক জরুরি কথা আছে।

ইত্তেফাক প্রতিনিধি এবং ভাসানী ভক্ত মাহমুদ আলম খানকে সঙ্গে নিয়ে গেলাম। পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধ্যা গড়িয়ে গেল।

কাঁচা বাড়িতে ঢুকে দেখি মওলানা ভাসানী লুঙ্গি পরে গামছা কাঁধে বারান্দায় বসে অপেক্ষা করছেন। দেখেই বললেন, হাত-মুখ ধুয়ে এসো। আগে খাওয়া, পরে কথা। একটি মাদুর পেতে মওলানা সাহেবের সঙ্গে বসলাম খেতে। অতি সাধারণ খাবার। ভাত, ডাল, সবজি ও মাছ; সঙ্গে কাঁচা লঙ্কা কাঁচা পেঁয়াজ। তবে পরিমাণে প্রচুর খেলেন তিনি।

যখন তার সঙ্গে নানা জায়গায় ট্যুরে গেছি, তখন স্থানীয় আয়োজন হতো রিচ ফুড এর। তাতেও মওলানা সাহেব দমে যেতেন না। দিব্যি খেয়ে যেতেন বেশ ভালো পরিমাণেই। তবে যখন যেমন তখন তেমন এমনই ছিল তার খাদ্যাভ্যাস।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান :এবার বলি বঙ্গবন্ধুর কথা। সুযোগ হলেও তার খাওয়া বিশেষভাবে কখনও খেয়াল করিনি। তিনি রিচ ও হালকা- যখন যা পেতেন তাই খেতেন।

১৯৬৭ সালে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে তিনি দেওয়ানি ওয়ার্ডে, আমি পুরোনো ২০ সেলে। একদম সামনা-সামনি। ভাবি বেগম ফজিলাতুন্নেছা ও শেখ হাসিনা একদিন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ইন্টারভিউতে এসে অতি সুস্বাদু নানা ধরনের খাবার দিয়ে যান। রাতে বঙ্গবন্ধু সব আইটেমই বেশ ভালো পরিমাণে আমাকে পাঠালেন। পরম তৃপ্তির সঙ্গে খেলাম। ভাবির হাতের অসাধারণ সুস্বাদু রান্না। জানি না ওই ধরনেরই ছিল কিনা বঙ্গবন্ধুর দৈনন্দিন খাবার।

অধ্যাপক মোজাফ্‌ফর আহমেদ :মস্কোপন্থি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সভাপতি (প্রয়াত) অধ্যাপক মোজাফ্‌ফর আহমেদের সহকর্মী হিসেবে ১৯৫৭ সাল থেকে দীর্ঘদিন নানা পদে তাঁর সহকর্মী ছিলাম (১৯৯৩ সাল পর্যন্ত)। এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় তার সঙ্গে নানা স্থানে সভা-সমিতি, সম্মেলন উপলক্ষে সফরও করেছি।

তার খাবার ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। অতিরিক্ত স্বাস্থ্য সচেতন অধ্যাপক মোজাফ্‌ফর আহমেদ। আজীবন অতি সাধারণ খাবার খেয়েছেন। বিভিন্ন জেলায় সফরকালে দলীয় নেতারা রিচ ফুড-এর আয়োজন করলে তিনি খেপে যেতেন। তিনি খেতেন সাদা ভাত, সবজি আর মাগুর মাছের ঝোল এবং হালকা মসলায় রান্না মুরগির মাংস। তিনি বেঁচেও গেছেন সব নেতার চেয়ে বেশি দিন।

সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, ঐক্য ন্যাপ

  • এই বিভাগের সর্বশেষ